আবুল কালাম আজাদ, ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলার যুবক ইয়াসিন শেখের স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। নানা চেষ্টায় তা না হলেও সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার স্বপ্নপূরণ হয় রাশিয়ায়। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন ইউক্রেন যুদ্ধে। কিন্তু ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় থেমে যায় তার সে স্বপ্নের যাত্রা। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ইয়াসিনসহ তার চার সহযোদ্ধার দেহ।
গত ২৭ মার্চ ২৫ ইউক্রেনে যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হন ইয়াসিন শেখ।
সেদিন ইয়াসিন নিহত হলেও পরিবার জানতে পারে ঈদের পরদিন অর্থাৎ ১ এপ্রিল ২৫। এ তথ্য জানায় রাশিয়ায় থাকা ইয়াসিনের বন্ধু মেহেদী। ইয়াসিনের মৃত্যুর খরব জানাজানি হওয়ার পর পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা গ্রামের মৃত সত্তর মিয়ার ছোট ছেলে ইয়াসিন শেখ। চার ভাইবোনের মধ্যে দু’জন আগেই মারা গেছেন। মা আর বড় ভাইকে নিয়ে ছিল তার সংসার। বড় ভাই ব্যবসায়ী রুহুল আমিন তার পড়াশোনা ও বিদেশযাত্রার খরচ বহন করেন।
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেয়ার ছবি ও ভিডিও নিয়মিত নিজের ফেসবুকে আপলোড করতেন ইয়াসিন। গত ১ মার্চ ফেসবুকে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে রাশিয়ায় যাওয়া, সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া এবং তার স্বপ্নপূরণ নিয়ে একটি ভিডিও আপলোড করেন ইয়াসিন।
ইয়াসিন ওই ভিডিওতে জানিয়েছেন, গত বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে চাকরির জন্য আবেদন করে। গত সেপ্টেম্বর মাসে অফার লেটার পেয়ে চলে যায় রাশিয়া। মস্কো থেকে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরের ওই কোম্পানিতে তিন মাস চাকরির পর অনলাইনে আবেদন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে যোগ দেন।
দেশে না হলেও বিদেশে সৈনিক হয়ে বাবার স্বপ্নপূরণ হয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই ভিডিওতে স্মৃতিচারণ ও দোয়া প্রার্থনা করেন । যুদ্ধে মৃত্যু হলেও তার কোনো আফসোস থাকবে না বলেও সেদিন ভিডিওতে জানিয়েছিলেন ইয়াসিন।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ওই ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করার মাস না পেরুতেই যুদ্ধে ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় নিহত হন ইয়াসিন।
ইয়াসিনের চাচাতো ভাই রফিকুল ইসলাম রবি জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে রাশিয়ান ভাষা শেখে ইয়াসিন। পরে বন্ধুর সহায়তার ইয়াসিন রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে ভালো চাকরি পায়। সবই ঠিকটাক মতো চলছিল। পরে রাশিয়া সেনাবাহিনী যোগ দিয়ে সব উলটপালট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়ায় যাওয়ার সময় ইয়াসিনের মা ও বড় ভাইকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে অনাপত্তিপত্রে তাদের স্বাক্ষর নেয় রাশিয়ায় পাঠানো এজেন্সির লোকজন। গত ২৬ মার্চ তার মায়ের সাথে শেষবারের মতো কথা বলে ইয়াসিন। কয়েকদিনের মধ্যেই ১০ লাখ টাকা পাঠাবে বলে মাকে জানিয়েছিল সে।’
নিহত ইয়াসিনের লাশের কী অবস্থা, লাশ দেশে আনা যাবে কি-না, তা নিয়ে কোনো তথ্যই পাচ্ছে না ইয়াসিনের পরিবার। ছেলের ছবি নিয়ে মায়ের কান্না থামছেই না। শোকে হতবিহবল পরিবারের সদস্যরা। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
এদিকে, খবর পেয়ে গৌরীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি সুনন্দা সরকার প্রমা মরিচালি গ্রামে ইয়াসিনের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদুল হাসান জানান, বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এ ব্যাপারে সকল প্রকার আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।