প্রতিনিধি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১১:৪০:১০ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ একদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং দ্রুততম সময়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় (১১ ডিসেম্বর) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। এর মাত্র ১৬ দিন পর, দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এরপর ২৭ ডিসেম্বর তিনি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে একদিনেই ভোটার আবেদন, ছবি তোলা এবং ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে ভোটার হন।

নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমানের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।আইনের চোখে ভোটার তালিকা হালনাগাদভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা হালনাগাদ বা সংশোধনের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও সময়সীমা রয়েছে। আইনের ধারা ১১ অনুযায়ী, কম্পিউটার ডাটাবেজে সংরক্ষিত বিদ্যমান সকল ভোটার তালিকা প্রতি বছর ২ জানুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত অথবা তফসিল ঘোষণার পূর্বে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত সময়ের মধ্যে হালনাগাদ করা হয় [১]।
তবে, এই সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি হলো ধারা ১০ (ভোটার তালিকা সংশোধন)। এই ধারা অনুযায়ী, “বিভিন্ন নির্বাচিত সংস্থার নির্বাচনের সময়সূচী ঘোষণার তারিখ হইতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়কাল ব্যতিরেকে, অন্য যে কোন সময়” ভোটার তালিকা সংশোধন করা যাইবে [১]। অর্থাৎ, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন পর্যন্ত সময়কালকে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কার্যত ‘কালো সময়’ (Blackout Period) হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সময়ে নতুন করে ভোটার হওয়ার বা তালিকা সংশোধনের সুযোগ থাকে না।ঘটনাতারিখআইনি প্রেক্ষাপটত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা১১ ডিসেম্বর ২০২৫ভোটার তালিকা সংশোধনের ‘কালো সময়’ শুরু [১]তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন২৫ ডিসেম্বর ২০২৫দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরা তারেক রহমানের ভোটার হওয়া
২৭ ডিসেম্বর ২০২৫তফসিল ঘোষণার ১৬ দিন পর নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তিকরণতফসিল পরবর্তী ভোটার: আইনি প্রশ্ননির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমানের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রশ্ন ১: ধারা ১০ এর লঙ্ঘন? আইনের ধারা ১০ অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর ভোটার তালিকা সংশোধনের সুযোগ নেই। তারেক রহমান যেহেতু তফসিল ঘোষণার (১১ ডিসেম্বর) পরে (২৭ ডিসেম্বর) ভোটার হয়েছেন, তাই এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি আইনের এই ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকে।
প্রশ্ন ২: বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ? নির্বাচন কমিশন কি কোনো বিশেষ ক্ষমতা বা অধ্যাদেশের বলে এই কাজ করেছে? যদিও জুলাই ২০২৫ সালে জারি হওয়া ‘ভোটার তালিকা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নির্বাচন কমিশনকে তফসিল ঘোষণার আগে বছরের যেকোনো সময় ভোটার তালিকা প্রকাশ ও সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে [২]। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পরের সময়কালের জন্য এই অধ্যাদেশ ধারা ১০ এর সীমাবদ্ধতা বাতিল করেছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। যদি কমিশন বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে, তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের কারণ ও আইনি ভিত্তি জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন ৩: সাধারণ নাগরিকের অধিকার? যদি তারেক রহমানের মতো একজন ভিআইপি নাগরিকের জন্য তফসিল ঘোষণার পরেও একদিনে ভোটার হওয়ার সুযোগ থাকে, তবে সাধারণ নাগরিক যারা তফসিলের কারণে ভোটার হতে পারেননি, তাদের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ দেওয়া হবে কিনা, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এই ধরনের বিশেষ সুবিধা আইনের চোখে সমতার নীতি লঙ্ঘন করে কিনা, তা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।কমিশনের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়াএ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে, কমিশন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে হয়তো বিশেষ বিবেচনা বা দ্রুত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু আইনের ধারা ১০ এর স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। তফসিল ঘোষণার পর যদি নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন হয়, তবে হয় আইন সংশোধন করতে হবে, নয়তো বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে। অন্যথায়, এটি ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

















