প্রতিনিধি ১০ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:৫৭:১২ প্রিন্ট সংস্করণ
লেখক জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ানঃ আমি ব্যক্তিগতভাবে গণতন্ত্রের পক্ষের মানুষ নই। রাজনীতি নিয়েও আমার নিয়মিত লেখালেখি নেই। বাংলাদেশের রাজনীতি এতটাই কলুষিত, এতটাই রক্ত, চাঁদাবাজি ও প্রতারণায় ভরা যে—তা নিয়ে লিখতে আমার রুচিতে আসে না। কিন্তু যখন এই নোংরা রাজনীতির আড়ালে সাধারণ, নিষ্পাপ মুসলমানদের ঈমানকে পুঁজি বানানো হয়, যখন মানুষের আমল, আকিদা ও পরকালের ভয়কে ভোটের মিছিলে নামানো হয়—তখন নীরব থাকা আর সম্ভব হয় না।

ইসলামের নামে ভণ্ডামি শুরু হলে সেখানে চুপ থাকা কোনো ভদ্রতা নয়—তা সরাসরি অপরাধ।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো জুলুম করবে, চাঁদাবাজি করবে, ক্ষমতার জন্য রক্ত ঝরাবে—এটা দুঃখজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়। কারণ তারা নিজেদের রাজনীতির সঙ্গে ইসলামকে জড়িয়ে বৈধতা খোঁজে না। তারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে না। তাই তাদের অপরাধ রাজনৈতিক, প্রকাশ্য এবং নগ্ন। তারা অপরাধী—নিশ্চয়ই। কিন্তু ইসলামের নাম ব্যবহার করে যে অপরাধ করা হয়, তার ক্ষতি হাজার গুণ বেশি। কারণ সেখানে শুধু মানুষ নিপীড়িত হয় না—ধ্বংস হয় বিশ্বাস, ভেঙে পড়ে ঈমান।
গণতন্ত্রে মুসলমান নিরাপদ নয়—এটা তাত্ত্বিক কথা নয়, বাস্তব সত্য। আর বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে সেই অনিরাপত্তা আরও নির্মম। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৪ বছর আগে, কিন্তু জনগণ আজও স্বাধীন হয়নি। তখন পাকিস্তানিরা জুলুম করত, আজ দেশীয় শাসকেরা করে—পার্থক্য শুধু শাসকের পরিচয়ে, জুলুমের স্বাদ একই।
এই গণঅভ্যুত্থানে আমরা কী অর্জন করেছি? একজন স্বৈরাচার সরিয়েছি, আরেকজন বিদেশি দালাল বসিয়েছি। যদি সত্যিকার অর্থে বর্তমান উপদেষ্টারা জনগণের প্রতিনিধি হতেন, তাহলে হাদি হত্যার বিচার এতদিন ঝুলে থাকত না। দিনের আলোয় রাস্তায় গুলি খেয়ে একজন তরুণ প্রাণ হারাল—রাষ্ট্র আজও বিচার দিতে পারেনি। এটা কি অক্ষমতা, না জনগণের সঙ্গে নগ্ন বিশ্বাসঘাতকতা?
এই দীর্ঘ হতাশার ভেতর সাধারণ মানুষ বিশ্বাসের আশ্রয় খুঁজেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের দিকে। কিন্তু আজ সেই বিশ্বাসও ভাঙছে। কারণ ইসলামের নাম ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে পুঁজি বানিয়ে শেষ পর্যন্ত ইসলামকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।
মাওলানা আবুল আলা মওদূদী রহ. এর জামায়াত আজ আর নেই। নামটি আছে, কিন্তু চিন্তাধারা নেই। মওদূদী রহ. কখনো ইসলামকে গণতন্ত্রের ভেতর ঢুকিয়ে রাজনৈতিক খিচুড়ি বানাননি। তিনি ইসলামকে ক্ষমতার দাস বানাননি। অথচ আজকের কিছু নেতার বক্তব্য শুনলে স্পষ্ট বোঝা যায়,ক্ষমতার লোভে মওদূদীর চিন্তাধারাকেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আজ এমন এক ভয়ংকর পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে পরিস্থিতি, যখন ইসলামী দলের পরিচয়ধারী কিছু নেতার মুখ থেকে এমন কথা বের হয়—যা শুনে ঈমান কেঁপে ওঠে। যখন গণতান্ত্রিক ভোটকে জান্নাত-জাহান্নামের চূড়ান্ত দলিল বানানো হয়, যখন নবীদের কুরবানির সঙ্গে ব্যালটের তুলনা করা হয়—তখন চুপ থাকা মানে এই ভণ্ডামির দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।
রাজনীতি করুন—আপনাদের অধিকার। ক্ষমতার চেষ্টা করুন—সেটাও আপনাদের বিষয়। কিন্তু মানুষের ঈমান নিয়ে খেলবেন না। ইসলামের পবিত্রতাকে ব্যালট বাক্সে নামাবেন না। আল্লাহর দ্বীনকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করবেন না। মনে রাখবেন—মানুষের আদালত এড়িয়ে যাওয়া যায়, ইতিহাসকে বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু আল্লাহর আদালত থেকে পালানোর কোনো রাস্তা নেই।
ইসলামকে ইসলামের জায়গায় থাকতে দিন। রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় রাখুন। দ্বীনকে ক্ষমতার খিচুড়িতে পরিণত করবেন না।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো,মিশর

















