প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:৩৭:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ
মুক্তকথন ডেস্ক : ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি ছিল একটি মানসিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সূচনা। বিশেষ করে ছাত্র ও যুবসমাজের রাজনীতি-চিন্তায় এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনীতি তাদের কাছে আতঙ্ক, জবরদস্তি ও দখলদারিত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই রাজনীতির বদলে তারা এখন খুঁজছে মানবিক, অংশগ্রহণমূলক ও ছাত্রবান্ধব নেতৃত্ব।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এই সময়ে ছাত্র রাজনীতি কার্যত পরিণত হয়েছিল ভয় ও নিপীড়নের এক ছায়া-রাজনীতিতে। অভিযোগ রয়েছে—ছাত্রস্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে তারা হল দখল, সিট বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, মাদকসংশ্লিষ্টতা ও ভিন্নমত দমনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। ফলে ক্যাম্পাসে রাজনীতি মানেই হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের নাম।
এই দীর্ঘ নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভই বিস্ফোরিত হয় ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে। এর মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে এক নতুন চেতনার জন্ম হয়—শিক্ষাবান্ধব, নৈতিকতাভিত্তিক ও সেবামুখী রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু),জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জকসু)জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চাকসু)—প্রায় সবগুলোতেই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।
এখানেই উঠে আসে মূল প্রশ্ন—জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি বিএনপি সমর্থিত ছাত্রদলকে উপেক্ষা করে তরুণ ভোটাররা কেন ছাত্রশিবিরকে বেছে নিল?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে তরুণদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম ঘুনে ধরা’ রাজনীতি পছন্দ করে না। তারা জোর করে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া মানসিকতা প্রত্যাখ্যান করে। তারা চায় অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, যেখানে ভয় নয়, থাকবে আস্থা; দখল নয়, থাকবে সেবা।
ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে যে ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে—তা তরুণ সমাজের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করেছে। তারা মনে করছে, এই সংগঠন ক্ষমতায় গেলেও ছাত্রদের ওপর জোরজবরদস্তি করবে না, হল দখল বা সিট বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ডে জড়াবে না।
অন্যদিকে, ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ—এই দুই সংগঠনের মধ্যে কার্যত কোনো মৌলিক পার্থক্য তরুণরা খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের কাছে এই দুই সংগঠনই ক্ষমতাকেন্দ্রিক, পুরোনো ধাঁচের এবং দমনমূলক রাজনীতির ধারক হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। ফলে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট।
বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর ভয় কাজ করে। অতীতের কিছু বিতর্কিত ও বেদনাদায়ক ঘটনার স্মৃতি এখনো তাদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে। রাজনীতির সঙ্গে জড়ালেই নিরাপত্তা হারানোর আশঙ্কা—এই ধারণা ভাঙতে ছাত্রদল বা বিএনপি এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখাতে পারেনি।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো—বর্তমান তরুণ সমাজ সংসদ থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস—সবখানেই তরুণদের প্রতিনিধিত্ব চায়। তারা আর সিনিয়র-নির্ভর, বন্ধ দরজার রাজনীতি মেনে নিতে রাজি নয়।
এই জায়গায় ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে মেধাবী ও উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব সামনে আসতে পারে না। এর ফলে ছাত্রদল তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।
সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিএনপির নীরবতাও তরুণ সমাজে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি ছিলেন তরুণদের কাছে জনপ্রিয় জিএনজি লিডার। অথচ এই ঘটনায় দলটির অবস্থান ছিল অস্পষ্ট ও দুর্বল—এমনটাই ধারণা তরুণদের একটি বড় অংশের।
আজ রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও বিভাগীয় শহর রাজশাহী—এই প্রধান শহরগুলোর ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব কার্যত ছাত্রশিবিরের হাতে চলে গেছে। ভবিষ্যতে এসব শহরকেন্দ্রিক যেকোনো আন্দোলন, কর্মসূচি বা রাজনৈতিক চাপ তৈরিতে তাদের ভূমিকা নির্ধারক হবে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনেকে আশা করেছিলেন, বিএনপির রাজনীতিতে এক নতুন মোড় আসবে। কিন্তু জাকসু নির্বাচনে তার উপস্থিতি কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে—তরুণ সমাজ এখনো বিএনপির চলমান রাজনীতির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার রয়েছে। সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে—আগামী জাতীয় নির্বাচনেও এই তরুণ শক্তি বড় ভূমিকা রাখবে।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই সম্ভবত তারেক রহমান সম্প্রতি ডাকসু নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে সহাবস্থানমূলক রাজনীতির কথা বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উপলব্ধি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে?
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান ছাত্র ও তরুণ সমাজ ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী শক্তির কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—বিএনপি কি তাদের নেতৃত্বের কাঠামো, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক ভাষায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারবে? নাকি তারা অতীতের রাজনীতিতেই আবদ্ধ থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র।
লেখক পরিচিতি:
মোঃ কামরুল হাসান (এলএলবি)
সভাপতি
সাংবাদিক ঐক্য পরিষদ
















