সারাদেশ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত গবেষণার জন্য পৃথক ইনস্টিটিউশন তৈরির নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

  প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ৫:০৭:১৬ প্রিন্ট সংস্করণ

আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা ২০২৬-২০৫০ উপস্থাপন করেছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।

এ মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হলো দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।

সভায় আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার পলিসি গ্যাপ চিহ্নিত করে তা সংক্ষেপে পর্যালোচনা হয়েছে। নতুন মহাপরিকল্পনা তিন ধাপে (প্রথম ধাপ ২০২৬-২০৩০ সাল, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০-২০৪০ সাল ও তৃতীয় ধাপ ২০৪০-৫০ সাল) বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ এর মধ্যে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রায়োরিটি প্রজেক্টস পরিকল্পনায় অফশোর অনুসন্ধান রাউন্ড (Offshore Exploration Round), গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি (Gas Production Boost), এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (LNG Supply Security), রিফাইনারি সক্ষমতা সম্প্রসারণ (Refinery Capacity Expansion), কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সম্প্রসারণ (Strategic Storage Expansion) এর কাজ হবে।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পসমূহে অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূ-তাপীয় (জিওথার্মাল) শক্তি উন্নয়ন এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক শক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিস্তারিতভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের খুটিনাটি তুলে ধরার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এখানে। এটা সবল হলে অর্থনীতি দাঁড়াবে। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনকে এই খাত প্রভাবিত করে।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত গবেষণার জন্য পৃথক ইনস্টিটিউশন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আলাদা ইনস্টিটিউট হতে হবে। এটা মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলে চলবে না। এটি একটি আলাদা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হবে যা পৃথিবীতে এ সম্পর্কিত যত সংস্থা আছে সবকটির সাথে যোগাযোগ রাখবে এবং পলিসি তৈরিতে সরকারকে সাহায্য করবে।’

অতীতে যা হয়েছে সবই খাপছাড়া উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘একদম শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে। একরকমভাবে হয়ে আসছে সেজন্য সেই পথেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনেককিছু ভুল লোকেশনে, ভুল স্ট্রাকচারে হয়েছে। এমনটা যেন আর না ঘটতে পারে। একটা কাঠামো, নিয়মের মধ্যে যেন থাকে সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য গবেষণাকেন্দ্র জরুরি।’

প্রধান উপদেষ্টা বিকল্প উৎস নিয়েও গবেষণার নির্দেশ দিয়েছেন।

মন্ত্রণালয় জানায়, এই মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কীভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করে জলবায়ু প্রভাব কমানো সম্ভব এবং একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি করা যায় তা তুলে ধরা হয়েছে।

বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৫৯ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে, যা পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট নিঃসরণ বাড়বে, তবে পরিচ্ছন্ন ও অধিক দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে (০.৬২ থেকে ০.৩৫ টন CO₂/মেগাওয়াট-ঘণ্টা)।

২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু সংক্রান্ত উদ্যোগসমূহের মাধ্যমে বার্ষিক ৬৪.৫ মিলিয়ন টন কার্বণ ডাই অক্সাইড এবং মোট ১,৬০০ মিলিয়ন টন কার্বণ ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব হবে।

মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ (যা সাধারণত কুইক রেন্টাল আইন নামে পরিচিত) তা বাতিল করা হয়েছে, মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫ গ্রহণ করা হয়েছে এবং রিনিউবেল এনার্জি পলিসি ২০২৫, রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম ২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ গ্রহণ করা হয়েছে।

আজকের সভায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, ট্রান্সমিশন, সরবরাহ, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সাস্টেইনবিলিটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রাইমারি এনার্জি সেক্টরকে আরও নিরাপদ, দক্ষ, কম আমদানিনির্ভর ও আর্থিকভাবে টেকসই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২০৫০ মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০–৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ১০৭.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

Author

আরও খবর

Sponsered content